ঢাকা ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी
ব্রেকিং নিউজ ::
রমাজান মাস উপলক্ষে আগামী ১২ই মার্চ থেকে ৭১ নিউজ বিডির হোম পেজে লাইভ টিভি চালু হবে। ৭১ নিউজ টিভিতে সাহরি এবং ইফতারের আগে লাইভ ইসলামী অনুষ্ঠান ও আযান সম্প্রচার করা হবে।

যে কারণে চীনের মেয়েরা এত হতাশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:১৬:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩
  • / ৪১১ বার পড়া হয়েছে
৭১ নিউজ বিডির সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চীনে নারী-পুরুষের ব্যবধানটা বেশ প্রকট। গত বছরের হিসাবমতে, দেশটিতে নারীর সংখ্যা ৬৯ কোটি, আর পুরুষের সংখ্যা ৭২ কোটি ২০ লাখ। এর পেছনে চীনের ‘এক সন্তান নীতি’ দায়ী বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। যদিও এ নীতি থেকে ২০১৫ সালে সরে এসেছে চীন সরকার।

চীনে যখন এক সন্তান নীতি ছিল, তখন তা কঠোরভাবেই প্রয়োগ করেছিল চীন সরকার। তারপরেও অনেক দম্পতি জরিমানা দিয়ে, অনেক সুযোগ সুবিধা স্বেচ্ছায় পায়ে দলে কিংবা নিজেদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ঘোষণা করে একাধিক সন্তান জন্ম দিত। কারণ এই দম্পতিদের প্রথম সন্তান ছিল মেয়ে। তারা আশা করত, তাদের দ্বিতীয় সন্তান হবে ছেলে।

প্রায় তিন দশক ধরে এক সন্তান নীতি কার্যকর ছিল চীনে। ২০১৫ সালে সেই নীতি থেকে সরে আসে চীন সরকার এবং ২০১৬ সালে দুই সন্তান নীতি চালু করে। এরপর ২০২১ সালে তিন সন্তান নীতি চালু করেছে চীন।

যাই হোক, চীনা সমাজে আজও মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মূল্য বেশি—এমন বিশ্বাস শিকড় গেড়ে রয়েছে। বেশির ভাগ চীনারা মনে করেন, নিজের উত্তরাধিকার ও বংশধারা বজায় রাখার জন্য ছেলে সন্তান থাকা জরুরি। মেয়েরা তো বিয়ে হয়ে অন্যের সংসারে চলে যাবে এবং সেখানে ছেলে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া চীনের অনেক মানুষ মনে করে, পরিবারের কন্যা সন্তানেরা ছেলে সন্তানের আর্থিক ব্যয়ভারও নিজের কাঁধে তুলে নেবে। বলা বাহুল্য, চীনের এসব প্রাচীন সামাজিক বিশ্বাসের ফলে নারীরা আজও সামাজিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

গত কয়েক বছরে চীনের টেলিভিশনগুলোতে ‘ওড টু জয়’, ‘অল ইজ ওয়েল’ এবং ‘আই উইল ফাইন্ড ইউ আ বেটার হোম’ নামের সিরিজগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সিরিজগুলোতে নারীর প্রতি পারিবারিক বৈষম্য এবং অশোভন আচরণ তুলে ধরাই এই জনপ্রিয়তার কারণ বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকেরা।

এসব অসহনীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক চীনা নারীই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন। ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির মার্কেটিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক চিহ লিং লিউ এ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, ‘চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঝিহু ও বিলিবিলিতে পোস্ট করা লেখা ও ভিডিও গবেষণা করে দেখেছি, হাজার হাজার পোস্ট শুধু কীভাবে ছেলে সন্তানদের পরিবারে প্রধান্য দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। এ থেকেই বোঝা যায়, এই সমাজে বড় হতে হতে একটা মেয়েকে কতটা শোষণ ও বঞ্চনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।’

যেসব পরিবারে ছেলে সন্তানকে ভয়ংকরভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেসব পরিবারে মেয়ে সন্তানেরা ভীষণ হীনমন্ম্যতার মধ্য দিয়ে বড় হয়। জন্মের পর থেকেই তারা বুঝে যায়, এ সংসারে তারা অস্পৃশ্য ও অপ্রয়োজনীয়। মা বাবা যেন দয়া করে জন্ম দিয়েছে তাদের, শুধু এ জন্যই তাদের চীরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তারা পরিবারে সম্পদ হওয়ার অযোগ্য।

ছোটবেলা থেকেই চীনা মেয়েদের মাথায় এসব চিন্তা এত গভীরভাবে গেঁথে দেওয়া হয় যে, তারা বড় হওয়ার পরেও ব্যাপক নিরপাত্তাহীনতায় ভোগে। তাদের আত্মসম্মানবোধ এতটাই খাদের কিনারে থাকে যে, তারা জোর গলায় নিজের অধিকারটুকুর কথাও বলতে পারে না।

চীনের একটি সিনিয়র হাই স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কানাডীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশনকে বলেন, ‘পরিবারে আমার কোনো মূল্য নেই। আমি শুধু আর্থিক জোগানদাতা মাত্র। এই অনুভূতি যে কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। প্রায়ই মনে হয়, আত্মহত্যা করি। আমি বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মা সরাসরিই আমাকে বলেন, আমি তোমাকে মানুষ করেছি আমার বাধ্যর্কের নিরাপত্তার জন্য। তুমি মাসে মাসে আমাদের টাকা দেবে এবং তোমার ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচও চালাবে। এসব কারণে এতটা চাপ অনুভব করি যে কয়েকদিন আগেই সিঁড়ি থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম।’

চীনা সমাজে ছেলে সন্তান যে কতটা আরাধ্য বস্তু, সে বিষয়টিও ফুটে উঠেছে ওই শিক্ষার্থীর মন্তব্যে। তিনি বলেন, ‘আমার চাচি তখন অন্তসত্ত্বা। আমি বেশ ছোট। আমার চাচা তখন প্রায়ই আমাকে বলতেন, প্রার্থনা করো যেন তোমার একটা ভাই হয়। তাহলে তোমাকে মুরগির ঝোল খাওয়াব।’

সামাজিক এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের অনেক নারীই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। পিতৃতান্ত্রিক বংশধর এবং উত্তরাধিকারের পাশাপাশি পিতামাতার কর্তৃত্বের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তারা আজ ক্লান্ত। কিন্তু যুগ যুগ ধরে যে সামাজিক প্রথা ও মূল্যবোধ চলে আসছে, তা তো এত সহজে ভাঙা সম্ভব নয়। তাই যেসব নারী ক্ষুব্ধ হয়ে পরিবার থেকে বের হয়ে যান, তারাও সামিজকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাদের কেউ ভালো চোখে দেখে না। তারা কোথাও আশ্রয় পান না। এমনকি পুরুষ সঙ্গীও খুঁজে পান না। এসব কারণে চীনা নারীরা বাধ্য হয়েই নিজ পরিবারের সঙ্গেই নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখেন।

অনেক পশ্চিমা দেশের মতো চীনেও এখন লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রচার করা হচ্ছে। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রজনন হারে লৈঙ্গিক ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা করা। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত শহুরে ও গ্রামীণ সমাজে ‘ছেলে সন্তানই একমাত্র আরাধ্য’ ধরনের প্রাচীন সংস্কৃতি জারি থাকবে ততদিন পর্যন্ত সরকারি এসব প্রচারণা ফলপ্রসু হবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

যে কারণে চীনের মেয়েরা এত হতাশ

আপডেট সময় : ০৬:১৬:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

চীনে নারী-পুরুষের ব্যবধানটা বেশ প্রকট। গত বছরের হিসাবমতে, দেশটিতে নারীর সংখ্যা ৬৯ কোটি, আর পুরুষের সংখ্যা ৭২ কোটি ২০ লাখ। এর পেছনে চীনের ‘এক সন্তান নীতি’ দায়ী বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। যদিও এ নীতি থেকে ২০১৫ সালে সরে এসেছে চীন সরকার।

চীনে যখন এক সন্তান নীতি ছিল, তখন তা কঠোরভাবেই প্রয়োগ করেছিল চীন সরকার। তারপরেও অনেক দম্পতি জরিমানা দিয়ে, অনেক সুযোগ সুবিধা স্বেচ্ছায় পায়ে দলে কিংবা নিজেদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ঘোষণা করে একাধিক সন্তান জন্ম দিত। কারণ এই দম্পতিদের প্রথম সন্তান ছিল মেয়ে। তারা আশা করত, তাদের দ্বিতীয় সন্তান হবে ছেলে।

প্রায় তিন দশক ধরে এক সন্তান নীতি কার্যকর ছিল চীনে। ২০১৫ সালে সেই নীতি থেকে সরে আসে চীন সরকার এবং ২০১৬ সালে দুই সন্তান নীতি চালু করে। এরপর ২০২১ সালে তিন সন্তান নীতি চালু করেছে চীন।

যাই হোক, চীনা সমাজে আজও মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মূল্য বেশি—এমন বিশ্বাস শিকড় গেড়ে রয়েছে। বেশির ভাগ চীনারা মনে করেন, নিজের উত্তরাধিকার ও বংশধারা বজায় রাখার জন্য ছেলে সন্তান থাকা জরুরি। মেয়েরা তো বিয়ে হয়ে অন্যের সংসারে চলে যাবে এবং সেখানে ছেলে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া চীনের অনেক মানুষ মনে করে, পরিবারের কন্যা সন্তানেরা ছেলে সন্তানের আর্থিক ব্যয়ভারও নিজের কাঁধে তুলে নেবে। বলা বাহুল্য, চীনের এসব প্রাচীন সামাজিক বিশ্বাসের ফলে নারীরা আজও সামাজিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

গত কয়েক বছরে চীনের টেলিভিশনগুলোতে ‘ওড টু জয়’, ‘অল ইজ ওয়েল’ এবং ‘আই উইল ফাইন্ড ইউ আ বেটার হোম’ নামের সিরিজগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সিরিজগুলোতে নারীর প্রতি পারিবারিক বৈষম্য এবং অশোভন আচরণ তুলে ধরাই এই জনপ্রিয়তার কারণ বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকেরা।

এসব অসহনীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক চীনা নারীই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন। ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির মার্কেটিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক চিহ লিং লিউ এ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, ‘চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঝিহু ও বিলিবিলিতে পোস্ট করা লেখা ও ভিডিও গবেষণা করে দেখেছি, হাজার হাজার পোস্ট শুধু কীভাবে ছেলে সন্তানদের পরিবারে প্রধান্য দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। এ থেকেই বোঝা যায়, এই সমাজে বড় হতে হতে একটা মেয়েকে কতটা শোষণ ও বঞ্চনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।’

যেসব পরিবারে ছেলে সন্তানকে ভয়ংকরভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেসব পরিবারে মেয়ে সন্তানেরা ভীষণ হীনমন্ম্যতার মধ্য দিয়ে বড় হয়। জন্মের পর থেকেই তারা বুঝে যায়, এ সংসারে তারা অস্পৃশ্য ও অপ্রয়োজনীয়। মা বাবা যেন দয়া করে জন্ম দিয়েছে তাদের, শুধু এ জন্যই তাদের চীরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তারা পরিবারে সম্পদ হওয়ার অযোগ্য।

ছোটবেলা থেকেই চীনা মেয়েদের মাথায় এসব চিন্তা এত গভীরভাবে গেঁথে দেওয়া হয় যে, তারা বড় হওয়ার পরেও ব্যাপক নিরপাত্তাহীনতায় ভোগে। তাদের আত্মসম্মানবোধ এতটাই খাদের কিনারে থাকে যে, তারা জোর গলায় নিজের অধিকারটুকুর কথাও বলতে পারে না।

চীনের একটি সিনিয়র হাই স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কানাডীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশনকে বলেন, ‘পরিবারে আমার কোনো মূল্য নেই। আমি শুধু আর্থিক জোগানদাতা মাত্র। এই অনুভূতি যে কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। প্রায়ই মনে হয়, আত্মহত্যা করি। আমি বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মা সরাসরিই আমাকে বলেন, আমি তোমাকে মানুষ করেছি আমার বাধ্যর্কের নিরাপত্তার জন্য। তুমি মাসে মাসে আমাদের টাকা দেবে এবং তোমার ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচও চালাবে। এসব কারণে এতটা চাপ অনুভব করি যে কয়েকদিন আগেই সিঁড়ি থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম।’

চীনা সমাজে ছেলে সন্তান যে কতটা আরাধ্য বস্তু, সে বিষয়টিও ফুটে উঠেছে ওই শিক্ষার্থীর মন্তব্যে। তিনি বলেন, ‘আমার চাচি তখন অন্তসত্ত্বা। আমি বেশ ছোট। আমার চাচা তখন প্রায়ই আমাকে বলতেন, প্রার্থনা করো যেন তোমার একটা ভাই হয়। তাহলে তোমাকে মুরগির ঝোল খাওয়াব।’

সামাজিক এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের অনেক নারীই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। পিতৃতান্ত্রিক বংশধর এবং উত্তরাধিকারের পাশাপাশি পিতামাতার কর্তৃত্বের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তারা আজ ক্লান্ত। কিন্তু যুগ যুগ ধরে যে সামাজিক প্রথা ও মূল্যবোধ চলে আসছে, তা তো এত সহজে ভাঙা সম্ভব নয়। তাই যেসব নারী ক্ষুব্ধ হয়ে পরিবার থেকে বের হয়ে যান, তারাও সামিজকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাদের কেউ ভালো চোখে দেখে না। তারা কোথাও আশ্রয় পান না। এমনকি পুরুষ সঙ্গীও খুঁজে পান না। এসব কারণে চীনা নারীরা বাধ্য হয়েই নিজ পরিবারের সঙ্গেই নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখেন।

অনেক পশ্চিমা দেশের মতো চীনেও এখন লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রচার করা হচ্ছে। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রজনন হারে লৈঙ্গিক ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা করা। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত শহুরে ও গ্রামীণ সমাজে ‘ছেলে সন্তানই একমাত্র আরাধ্য’ ধরনের প্রাচীন সংস্কৃতি জারি থাকবে ততদিন পর্যন্ত সরকারি এসব প্রচারণা ফলপ্রসু হবে না।