ঢাকা ০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ মার্চ ২০২৫, ১৪ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মেডিকেল ভিসা: বাংলাদেশের রোগীরা ভারত ছেড়ে চীনের পথে

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:৩৩:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫
  • / ৩৪৬ বার পড়া হয়েছে
৭১ নিউজ বিডির সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে। বিচারের জন্য তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধেও ভারত এখনো কোনো সাড়া দেয়নি।

তখন থেকেই বাংলাদেশিদের ভিসা দেয়ার স্বাভাবিক হার ব্যাপক মাত্রায় কমিয়ে এনেছে ভারত।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের উল্লেখ করে জানিয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল ভিসা প্রদান পুনরায় শুরু করার আবেদন জানালেও কর্মী সংকটের কথা বলে ভারতের পক্ষ থেকে তাতে ‘নারাজি’ দেয়া হয়েছে।

এই শূন্যস্থান পূরণে দ্রুতই এগিয়ে এসেছে চীন। দ্রুত এবং সহজে ভিসা দেয়া এবং বেশ কয়েকটি হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য নির্ধারণ করে দেয়ার আলোচনাও করেছে চীন।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা এক কূটনীতিক বলেছেন, “শূন্যতা তৈরি হলে, অন্যরা সেই স্থান পূরণ করবে। কেউ কেউ থাইল্যান্ড এবং চীন যাচ্ছেন।”

গত আগস্টের পর থেকে ভারত দিনে এক হাজারেরও কম মেডিকেল ভিসা দিয়েছে। এর আগে এই সংখ্যা ছিল দৈনিক পাঁচ থেকে সাত হাজার। চাকরির শর্তাবলী উল্লেখ করে কোনো সূত্রই রয়টার্সের কাছে নাম প্রকাশ করতে চাননি।

দুই দেশের সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ভারত ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশিকে ভিসা দিয়েছে, যার বেশিরভাগই চিকিৎসার কারণে। কিন্তু তারপর থেকে মেডিকেল ভিসার হার ক্রমাগত কমতে থাকায় চীনের জন্য একটি আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, “চিকিৎসা পর্যটন বাজারের সম্ভাবনা অন্বেষণ” করার লক্ষ্যে এই মাসেই একদল বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইউনান সফর করেছেন।

ওয়েন গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অন্তত ১৪টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে ২৩০ কোটি ডলারেরও বেশি (১ ডলার = প্রায় ১২০ টাকা) বিনিয়োগ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে কোনো দেশের এটিই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এই মাসেই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে চীন সফর করবেন।

বাংলাদেশে একটি ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল খোলার কথাও চীনের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পাশাপাশি, চিকিৎসা নিতে চীন যেতে চাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সহজতর করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দেশটি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তার দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা ক্রমাগত গভীর করার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক।

রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, “চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা কোনও তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি, এমনকি এটি তৃতীয় পক্ষের কারণ দ্বারা প্রভাবিতও নয়।”

এ বিষয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাতে সাড়া পায়নি রয়টার্স।

ভারতের ধীরগতির ভিসা প্রক্রিয়া ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। ভারত ভিসা সংকটের জন্য ঢাকার দূতাবাসে কর্মী ঘাটতি এবং নিরাপত্তা উদ্বেগকে কারণ হিসাবে দেখিয়েছে। আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকায় একটি ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা হয়েছিল।

ভিসা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশকে সাত বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ভারতীয় ঋণের প্রতিশ্রুতি নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের কিছু প্রকল্প প্রভাবিত হয়েছে এবং দুই পক্ষই নানা প্রকল্প নিয়ে আবার আলোচনা করছে।

এদিকে, চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। বাংলাদেশ চীনের জন্য তার বাজার আরও উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি চীন সফর করেছে। চীনা কর্মকর্তারা ‘পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়গুলো’ নিয়ে আলোচনা করার জন্য বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে দেখা করেছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে প্রথম বৈঠক আগামী মাসে থাইল্যান্ডে হতে পারে।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক হ্যাপিমন জ্যাকব মনে করেন ভারতের ঐতিহ্যগত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়ছে।

জ্যাকব বলেছেন, “দক্ষিণ এশিয়া একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে চীন বড় খেলোয়াড়দের মধ্যে একটি হয়ে উঠছে। প্রতিটি দক্ষিণ এশিয়ান দেশে ভারতের অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ছে।”

নিউজটি শেয়ার করুন

মেডিকেল ভিসা: বাংলাদেশের রোগীরা ভারত ছেড়ে চীনের পথে

আপডেট সময় : ০১:৩৩:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫

গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে। বিচারের জন্য তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধেও ভারত এখনো কোনো সাড়া দেয়নি।

তখন থেকেই বাংলাদেশিদের ভিসা দেয়ার স্বাভাবিক হার ব্যাপক মাত্রায় কমিয়ে এনেছে ভারত।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের উল্লেখ করে জানিয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল ভিসা প্রদান পুনরায় শুরু করার আবেদন জানালেও কর্মী সংকটের কথা বলে ভারতের পক্ষ থেকে তাতে ‘নারাজি’ দেয়া হয়েছে।

এই শূন্যস্থান পূরণে দ্রুতই এগিয়ে এসেছে চীন। দ্রুত এবং সহজে ভিসা দেয়া এবং বেশ কয়েকটি হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য নির্ধারণ করে দেয়ার আলোচনাও করেছে চীন।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা এক কূটনীতিক বলেছেন, “শূন্যতা তৈরি হলে, অন্যরা সেই স্থান পূরণ করবে। কেউ কেউ থাইল্যান্ড এবং চীন যাচ্ছেন।”

গত আগস্টের পর থেকে ভারত দিনে এক হাজারেরও কম মেডিকেল ভিসা দিয়েছে। এর আগে এই সংখ্যা ছিল দৈনিক পাঁচ থেকে সাত হাজার। চাকরির শর্তাবলী উল্লেখ করে কোনো সূত্রই রয়টার্সের কাছে নাম প্রকাশ করতে চাননি।

দুই দেশের সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ভারত ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশিকে ভিসা দিয়েছে, যার বেশিরভাগই চিকিৎসার কারণে। কিন্তু তারপর থেকে মেডিকেল ভিসার হার ক্রমাগত কমতে থাকায় চীনের জন্য একটি আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, “চিকিৎসা পর্যটন বাজারের সম্ভাবনা অন্বেষণ” করার লক্ষ্যে এই মাসেই একদল বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইউনান সফর করেছেন।

ওয়েন গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অন্তত ১৪টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে ২৩০ কোটি ডলারেরও বেশি (১ ডলার = প্রায় ১২০ টাকা) বিনিয়োগ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে কোনো দেশের এটিই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এই মাসেই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে চীন সফর করবেন।

বাংলাদেশে একটি ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল খোলার কথাও চীনের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পাশাপাশি, চিকিৎসা নিতে চীন যেতে চাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সহজতর করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দেশটি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তার দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা ক্রমাগত গভীর করার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক।

রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, “চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা কোনও তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি, এমনকি এটি তৃতীয় পক্ষের কারণ দ্বারা প্রভাবিতও নয়।”

এ বিষয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাতে সাড়া পায়নি রয়টার্স।

ভারতের ধীরগতির ভিসা প্রক্রিয়া ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। ভারত ভিসা সংকটের জন্য ঢাকার দূতাবাসে কর্মী ঘাটতি এবং নিরাপত্তা উদ্বেগকে কারণ হিসাবে দেখিয়েছে। আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকায় একটি ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা হয়েছিল।

ভিসা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশকে সাত বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ভারতীয় ঋণের প্রতিশ্রুতি নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের কিছু প্রকল্প প্রভাবিত হয়েছে এবং দুই পক্ষই নানা প্রকল্প নিয়ে আবার আলোচনা করছে।

এদিকে, চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। বাংলাদেশ চীনের জন্য তার বাজার আরও উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি চীন সফর করেছে। চীনা কর্মকর্তারা ‘পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়গুলো’ নিয়ে আলোচনা করার জন্য বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে দেখা করেছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে প্রথম বৈঠক আগামী মাসে থাইল্যান্ডে হতে পারে।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক হ্যাপিমন জ্যাকব মনে করেন ভারতের ঐতিহ্যগত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়ছে।

জ্যাকব বলেছেন, “দক্ষিণ এশিয়া একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে চীন বড় খেলোয়াড়দের মধ্যে একটি হয়ে উঠছে। প্রতিটি দক্ষিণ এশিয়ান দেশে ভারতের অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ছে।”